ঈশ্বর নেই ঈশ্বর আছে
কৈশোরে তাবলীগ জামাতে জীবনের বেশ কিছু সময় খরচ করেছি , তখন আমাদের মুখস্ত কিছু বয়ান ছিল যা আমরা নিয়মিত চর্বিত চর্বন করতাম -
"এই যে ভাই আম গাছে আম ধরে আম গাছে কাঠাল ধরে না , এইটা কার নেয়ামত ? অবশ্যই আল্লার , এই যে আমরা বাতাস থেকে নিঃশ্বাস নেই এইটা কার নেয়ামত , অবশ্যই আল্লার , তো ভাই যে আল্লাহ আমাদের রসনা তৃপ্তির জন্য এইসব ফলমূল দিচ্ছেন বাতাস দিয়ে আমাদের বাচিয়ে রাখছেন , আমাদের কি উচিত না সেই আল্লার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা , তো ভাই আসেন আমরা সেই রাব্বুল আলামিনের হুকুম আহকাম মেনে চলি , আমাদের কে ঈমান আনতে হবে সেই মহান মালিকের প্রতি যিনি আমাদের সৃষ্টি করেছেন ,আর ঈমান বা বিশ্বাস অর্জন করতে হলে আমাদের কে মেহনত করতে হবে , নবীর সাহাবাগন ইমান অর্জনের জন্য মেহনত করেছেন আমাদের ও তা করতে হবে এবং সেই সাথে জারী রাখতে হবে দাওয়াতের কাজ যা নবীওয়ালা কাজ , এই কাজের সওয়াব কিয়ামত পর্যন্ত আমলনামায় লেখা হতে থাকবে তো ভাই আসুন আমরা ঈমান কে মজবুত করতে জামাতে সময় দেই এবং সেই সাথে মানুষ কে ডাকি বিশ্বাসের পথে !"
আহ কত ভালো লাগতো তখন এইসব কথা , তখনো বুঝিনি যে যেখানে বিশ্বাসের শুরু সেখানেই জ্ঞানের সমাপ্তি ।অথ্যাত্ এই নবীওয়ালা কাজে মানুষকে দাওয়াত দেয়ার অর্থ তাদেরকে প্রশ্ন করার হাত থেকে মুক্তি দিয়ে তাদেরকে বিশ্বাস নামক এক অন্ধকূপে ফেলা দেয়া ।আর তাঁরা আজীবন বিশ্বাস নামক অন্ধকূপে পড়ে থেকে জীবনকে বেহুদা খরচ করে ফেলে , অথচ আমরা যখন বিবর্তনের সূত্র ধরে এক চেতনাশীল মগজের অধিকারী , আমরা চাইলেই আরো আরো বেশি চিন্তাশীল হতে পারি , জ্ঞানের রাজ্যে প্রবেশের জন্য আমরা প্রশ্ন করতে পারি। অথচ আমরা বিশ্বাস নামের এক অন্ধকূপে জলাঞ্জলী দিচ্ছি আমাদের সবটুকু সম্ভাবনা !
পায়ু পথে বায়ু বেরুলে অযু ভাঙে কি না -তা নিয়ে বিশ্বাসীগন যতটা চিন্তিত তার একাংশ যদি তারা নিজেদের স্ব স্ব কিতাব নিয়ে চিন্তা করত তাহলে বিশ্বাস নামক ভাইরাস কিছুটা হলেও কমতো । আজ আমি ঘুষ খাচ্ছি , অবৈধ পথে কাড়ি কাড়ি সম্পদের মালিক হচ্ছি আর শেষ বয়সে মসজিদে পাচবার মাথা ঠুকে দাওয়াত দিয়ে বেড়াচ্ছি অন্ধতা আর বিশ্বাসের , অনেকেই বলে থাকেন অনেক উচ্চশিক্ষিত ব্যাক্তিরাও বিশ্বাসী, তবে তুমি কোন উচ্চমাধ্যমিক পাশ করা এলে হে আমাদের ধর্ম শেখাতে ? হ্যা আমি দেখেছি অনেক কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের নামকরা শিক্ষক গনও প্রচার করে বিশ্বাসের বানী , খুলনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন প্রভাষক কে যখন আমি শয়তান কেন শয়তান হল সেই ইতিহাস ওয়াজে বসে বর্ননা করতে দেখে আমি খুব অবাক হয়েছিলাম ,পরে তার সাথে মিশে দেখেছি যে তিনি তার শিক্ষাদানের নির্দিষ্ট বিষয়ে যথেষ্ট জ্ঞান রাখা সত্ত্বেও তার মননে এবং চিন্তায় বিশ্বাসের কালো ভয়াবহ অন্ধকার । তিনি সমাজচেতনা বিষয়ে প্রাজ্ঞ নন অথচ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হবার গর্বে তিনি নিজেকে জ্ঞানের ডিপো মনে করেন এবং কখনোই তিনি তার অন্ধকার এবং বিশ্বাসের গহন গহীন কূয়ো থেকে উকি দিয়ে বিশ্ব দেখেন না ।আর তিনি এও বিশ্বাস করেন যে তিনি যে জ্ঞান বিশ থেকে বাইশ বছরের পরিশ্রমে অর্জন করেছেন তার সমস্তটাই আকাশে বসে থাকা কোন এক পঙ্গু ঈশ্বর তাকে দান করেছেন !
এই আমরা মানুষ কে এক পঙ্গু আরশে বসে থাকা পাছাহীন অদৃশ্য এক কিম্ভূত ইশ্বর কে বিশ্বাস করতে দাওয়াত দিয়েছি , অথচ কারো কাছে আমরা জানতে চাই নি আম গাছে কেন আম ধরে ? সেখানে কেন কাঠাল ধরে না ? বাতাস থেকে আমরা কেন অক্সিজেন নেই ? একটা অলীক কিম্ভুত সত্ত্বা কে আমাদের কেন মেনে নিতে হবে ? এইসব প্রশ্ন আমরা করতে চাই না , অথচ আমাদের মস্তিস্ক লক্ষ বছরের বিবর্তনে যে চিন্তা করার সক্ষমতা অর্জন করল , চেতনা নামক এক মহান অনূভূতি আমাদের সঙ্গি হল সেই ক্ষমতাকে আমরা ইশ্বর নামক এক কল্পিত সত্ত্বার কাছে সমর্পন করে দিলাম ।
ধরে নিন ঈশ্বর নামক কেউ একজন এই কল্পনাতীত মহাবিশ্ব তৈরি করেছেন , তো এই বিশাল মহাশূন্যে অনূজীর সদৃশ এক ছায়াপথের অতিক্ষুদ্র এক নক্ষত্রের ছায়ায় বেড়ে ওঠা পৃথিবী নামক ক্ষুদ্রতর এক গ্রহের মানুষ নামক প্রানীগুলোর প্রতি তার বিশেষ নজর রাখার দরকার নেই , কিংবা সেই ইশ্বর মানুষ নামের এই নশ্বর চেতনাধারী প্রানী সম্পর্কে আদৌ অবগত নন ,মহাকালের এই বিশাল বিপুল সময়ের তুলনায় আমার আপনার জীবন সেকেন্ডের ও খন্ডিত অংশ , কি দরকার এই সামান্য সময়টুকু আমাদের মগজকে বিশ্বাসের অন্ধকূপে ডুবিয়ে রাখার ? কি দরকার আমাদের মানুষ গুলোকে বিভ্রান্ত করার ? নিজেদের যদি আমরা বুদ্ধিমান মানুষ বলে দাবি করে থাকি তবে ইশ্বর নামক কোন অযথা প্রানী কে নিয়ে লাফালাফি করে এই স্বল্প সময়টুকু নষ্ট করা উচিত হবে না ।
আমাদের এখনো অনেকদূর এগোতে হবে ! সামান্য মানুষ হয়ে আমাদের ছুয়ে দিতে হবে বিপুল বিশাল মহাকাশের প্রান্ত , তবে হয়তো সেই বিপুলা মহাশূন্যের ইশ্বর চমকিত হয়ে স্বগোক্তি করবে - "বাহ -এক ক্ষুদ্র ছায়াপথের ক্ষুদ্রতর নক্ষত্রের ছায়ায় বেড়ে উঠা প্রানীগুলো বেশ বূদ্ধিমান তো !"
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন