একজন কাইয়ুম চৌধুরী ও আমাদের দৈন্যতা
গতকাল রাতে চিত্রশিল্পি কাইয়ুম চৌধুরী দেহত্যাগ করলেন ।বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের উচ্চাঙ্গসঙ্গীত উত্সবের চতূর্থ রাতে তিনি মঞ্চে ঢলে পড়েন , পরবর্তীতে হাসপাতালে নেয়া হলে ডাক্তাররা তাকে মৃত ঘোষনা করেন । তিনি বক্তৃতা করে নেমে গেলে অধ্যাপক আনিসুজ্জামান যখন বক্তৃতা শুরু করবেন ঠিক তখনই তিনি ফিরে এসে বলেন আমার আরেকটা কথা বলার ছিল তারপরেই তিনি মাথাঘুরে পড়ে যান । কি বলতে চেয়েছিলেন তিনি ? জানা হবে না আর কখনই ।
চিত্র শিল্পিরা গন মানুষের মাঝে পরিচিত হন খুবই কম । অনেক বিখ্যাত চিত্র শিল্পিকেই এই সত্য টা স্বিকার করে নিতে হবে । আমাদের কাইয়ুম চৌধুরী গনমানুষের মাঝে বেশ ভালোভাবেই পরিচিত ছিলেন । একজন শিল্প সাহিত্যের খোজ না রাখা বাঙালীকে যদি একজন চিত্র শিল্পির নাম বলতে বলা হয় তবে সে সবার আগে কাইয়ুম চৌধুরীর নামই নিবে । সেদিন আপিসে উইন্ডোজ পেইন্টে গিয়ে রং নিয়ে ঘষাঘষি করছিলাম যদিও ছবি আকার যোগ্যতা এবং জ্ঞান কোনটাই আমার নেই , এক সহকর্মী পেছন থেকে এসে বললেন আরে আপনি তো পুরো কাইয়ুম চৌধুরীর মত ছবি আকছেন , তার মন্তব্যেই বুঝলাম সে কখনো কাইয়ুম চৌধুরীর কোন ছবি দেখে নি অথচ সে চিত্র শিল্পি বলতে কাইয়ুম চৌধুরীকেই বোঝে ।
সকালে ঘুম ভেঙে বিডিনিউজের একটা সংবাদ দেখে পুরোটাই পড়লাম । মূলত প্রতিবেদনটাই গতকার রাতের সঙ্গীত উত্সবের বিস্তারিত রিপোর্ট করা হয়েছে , কে কে সঙ্গীত পরিবেশন করলেন , কে বক্তৃতা তা দিয়েছে এর ভেতরেই ক্রমান্বয়ে নাম এসেছে কাইয়ুম চৌধুরীর , এবং প্রতিবেদক খুব স্বাভাবিক ভাবেই তার জ্ঞান হারিয়ে পড়ে যাওয়া এবং পরবর্তীতে হাসপাতাল থেকে তার মৃত্যুর খবর আসা বর্ননা করেছেন । তারপরেও সঙ্গীত পরিবেশন হয়েছে হরিপ্রসাদ চৌরাসিয়া তার জাদুকরী বাশী শুনিয়ে রাত কে ভোর করেছেন ।
সঙ্গীত সাধনা অথবা ছবি আকা কিংবা কবিতা লেখা এ সবই তো আমাদের মানব দেহে ভর করে পারলৌকিক সৌন্দর্য অবলোকন করা অথবা করানো । অথচ যে মঞ্চে খানিকক্ষন আগে একজন শিল্পি একজন সৌন্দর্যের পূজারী ঢলে পড়লেন মৃত্যু নামক বিষাদের কোলে , সেই মঞ্চে এরপরেও কি করা যায় সৌন্দর্য চর্চা ? শুনলাম সেখানে এক মিনিট নীরবতাও পালন করা হয় , ওই এক মিনিটেই কি আমাদের সমস্ত শোক মিশে গেল মহাকালে ? কাল নাকি পঞ্চান্ন হাজার দর্শক ছিল সবাই কি ওই এক মিনিটের শোক কাটিয়ে আবার মগ্ন হতে পারলেন সঙ্গিতে ? একুশে পদক প্রাপ্ত একজন শিল্পির সম্মানার্থে স্থগিত কি হতে পারতো না অনুষ্ঠান ? এই কি আমাদের জাতীর ভদ্রতা ? এই কি আমাদের শূদ্ধ সঙ্গীত শুনতে যাওয়া মানুষের মনোজগত ? আমরা বাঙালীজাত টা হৃদয়বৃত্তির দিক থেকে এত দৈন্য কেন ? যে মঞ্চ একজন সূন্দরের পূজারীর মৃত্যুর মত বিষাদে ঢেকে যায় সেই মঞ্চেই এক মিনিটের দেখানো শোক পালন শেষে কিভাবে আমরা শূদ্ধ সঙ্গীতের আনন্দের জগতে প্রবেশ করি ? আমাদের শোক গুলো আরেকটু দীর্ঘস্থায়ী কেন হয় না ?
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন