আত্ম অনুসন্ধান পর্ব ১
আমরা কেন আধ্যাত্মিক প্রাণী? কারণ আমরা চিন্তা করতে পারি। চিন্তার এই দায় থেকেই আসে চরম সত্যের নিকট পৌঁছানোর আকাঙ্ক্ষা। কিন্তু দরিদ্র দেশগুলোতে আমাদের ভেতরের এই সচেতনতা অর্জনের আগেই আমরা পেটের দায়ে নষ্ট হতে থাকি। তখন আমাদের চিন্তার ভার কাঁধে তুলে নেয় মোল্লা-পুরোহিত গোষ্ঠী। তাঁদের দৃষ্টিতে আমরা তখন হয়ে উঠি বোধশূন্য, দুনিয়াকামী এক ধরনের মানুষরূপী পশু। তাই তাঁরা রূপক আর বয়ানের আশ্রয়ে আমাদের মুক্তি কামনায় ব্যস্ত হয়ে পড়েন এবং নিজেদের দুনিয়াবী ফায়দা অর্জন করতে থাকেন। তবে তাঁরা বুঝতে পারেন না যে, ওই প্রলেতারিয়েত মানুষগুলো ঠিক কতটা এগিয়ে গেল।
ফলে তাঁরা আধ্যাত্মিক গুরু হয়ে ওঠার বদলে যখন ওই দুনিয়াকামী মানুষের কাতারে শামিল হতে থাকেন, তখন কখনো কখনো তাঁদের ভেতরে ঈশ্বর বিদ্যুৎচমকের মতো এক চিলতে আলো ফেলে যান। তখন কেউ কেউ হুংকার দিয়ে লাইব্রেরি পোড়াতে চায়, আবার কেউ বলে, "ধুর! চল সব ছেড়ে-ছুঁড়ে হিমালয়ে চলে যাই।" আখেরে কেউ বুঝে উঠতে পারে না কী করা উচিত। তখন তাঁরা নেগেটিভ মার্কেটিং পলিসি ফলো করে এক হুজুর আরেক হুজুরের, এক গুরু আরেক গুরুর বদনাম করতে থাকেন এবং ধর্মগ্রন্থ ঘেঁটে এমন সব উদ্ধৃতি দিতে থাকেন, যাতে আমরা না বুঝেই এক ধরনের মায়াজালে আটকে পড়ি।
সৃষ্টির শেষ দিনে ঈশ্বর বললেন, “আমরা আমাদের মতো করে এবং আমাদের সঙ্গে মিল রেখে এখন মানুষ সৃষ্টি করি” (আদিপুস্তক ১:২৬)। পরে তিনি তাঁর “নিজস্ব স্পর্শে” তাঁর সমস্ত কাজ সম্পন্ন করলেন। ঈশ্বর মাটি বা ধূলি থেকে মানুষ সৃষ্টি করলেন এবং তার মধ্যে তাঁর নিজের নিঃশ্বাস ঢুকিয়ে তাকে জীবন দিলেন (আদিপুস্তক ২:৭)। তাই মানুষ ঈশ্বরের সৃষ্ট অন্যান্য সৃষ্টি থেকে সম্পূর্ণ আলাদা, যার দেহ জাগতিক/নশ্বর হলেও তার আত্মা ঐশ্বরিক/অমর।
বাইবেল অনুসারে, মানুষ কে? ঈশ্বর যখন ভেতরে নিঃশ্বাস ঢুকিয়ে দিলেন, তার মানে কি চেতনা? এর মানে আমাদের সবার মধ্যেই ঈশ্বরের সেই আত্মা চলমান। তবে কেন আমরা আকাশের দিকে হাত তুলি? হ্যাঁ, যে আকাশ থেকে এসেছিল সে তো ফিরে গেছে। এখন আকাশের দিকে তাকিয়ে অতীত রোমন্থন না করে, আমাদের নিজের ভেতরে নজর দিলেই সেই ঈশ্বরকে খুঁজে পাওয়া উচিত।
আল্লাহ! তিনি ছাড়া আর কোনো উপাস্য নেই। তিনি স্বাধীন ও চিরস্থায়ী ধারক, সব কিছুর ধারক। তন্দ্রা ও নিদ্রা তাঁকে স্পর্শ করে না। নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডলে যা কিছু রয়েছে সবই তাঁর। এমন কে আছে যে তাঁর অনুমতি ছাড়া তাঁর কাছে সুপারিশ করতে পারে? সামনে এবং পেছনের সবই তিনি জানেন। একমাত্র তিনি যতটুকু চান, ততটুকুই তাঁরা জানতে পারে। তাঁর আসন আসমান ও জমিন ব্যাপী, এবং এ দুইয়ের সংরক্ষণে তিনি ক্লান্ত হন না। তিনিই সর্বোচ্চ, মহিমান্বিত। (আয়াতুল কুরসি, সূরা আল-বাকারাহ, ২:২৫৫)
খেয়াল করে দেখুন, আল্লাহর বর্ণনায় বলা হচ্ছে, আল্লাহ এমন এক সত্তা, যাকে তন্দ্রা বা নিদ্রা স্পর্শ করে না। মানুষের মধ্যেও এমন কিছু আছে, যা ঘুমন্ত বা জাগ্রত অবস্থায়ও চলতে থাকে। আদিপুস্তকে যাকে বলা হচ্ছে ঈশ্বরের নিঃশ্বাস। সব মিলিয়ে মনে হয়, সবাই একই দিকে আঙুল তুলছেন—আমাদের সবারই একটা বিশাল, সর্বব্যাপী অস্তিত্বের সঙ্গে বিলীন হতে হবে, এবং সেটাই এক কাঙ্ক্ষিত স্থান। নিজের চেতনাকে খুঁজে নিয়ে সে অস্তিত্বে বিলীন না হওয়া পর্যন্ত আমাদের খোঁজ চলমান থাকবে।
তাহলে, এই যে বস্তুগত দুনিয়া—এটা কী? কোরআনে একে বলা হয়েছে পরীক্ষার স্থান, আর লালন একে বলেছেন আনন্দধাম। যদি গন্তব্য সম্পর্কে নিশ্চিত থাকা যায়, তবে পথ চলা আনন্দের হয়। কিন্তু যদি পথের শেষে কোনো ভয়ের বস্তু থাকে, তবে পথচলাটাও আনন্দময় হয় না। এই সত্যটা আমাদের দুনিয়াকামী মোল্লা-পুরোহিতদের কে বোঝাবে?

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন