দেশ জাতি বিভক্তি : একটি ব্যক্তিগত পর্যালোচনা

কি নিয়ে লেখা যায় কোন টপিক খুঁজে পাচ্ছিনা। দেশে এত এত টপিকের ভিড়ে আমার লেখার মালমসলা হারিয়ে গেছে। এই দেশে এখনও যে বেঁচে থেকে শ্বাস নিচ্ছি, তাই তো মাঝে মাঝে বিশ্বাস হতে চায় না। কত রকমের বিভেদ যে আমাদের মাঝে -- গুনতে বসলে মহাকাব্যের সমান বড় হয়ে যাবে।

নেতাদের রাজনীতির খেলায় আমরা বড় বেশি চুনোপুটী। নিজের পেটে ভাত যোগাতে এত বেশি ব্যস্ত থাকা লাগে যে, অন্য দিকে নজর দেওয়ার সময় থাকে না। আমাদের নেতারাও তাই চায় -- আমাদের মুখ বন্ধ রেখে তারা নিজের আখের ঠিকই গুছিয়ে নেয়। গত ৫মে হেফাজতের তাণ্ডবের পর থেকে লাশ ও হত্যা নিয়ে সংখ্যা তত্ত্বের খেলা খুব চলছে। আমরা হয়ত ফেসবুক ব্লগে খুব চিল্লাছি, কিন্তু আমাদের কথা কেউ পাত্তাই দিচ্ছে না। আমরা যতই প্রমাণ করি বাঁশের কেল্লা ও জামাতের বিভিন্ন পেজের মুনাফিকি ও মিথ্যাচার, তারা কিন্তু এসবকে পাত্তা না দিয়ে তাদের কাজ করে যাচ্ছে। তাদের টার্গেট গ্রুপ গ্রামের ও শহরের খেটে-খাওয়া বিপুল সংখ্যক মানুষ, যারা ইন্টারনেট ব্যবহার করে না। দিনশেষে টিভির সামনে বসে অথবা চলতি পথে চায়ের দোকানে এক ঝলক খবরই তাদের ভরসা দেশ সম্পর্কে খবর রাখার জন্য। আর এই মানুষগুলোকে টার্গেট করেই বিএনপি নেতারা বাঁশের কেল্লায় প্রচার হওয়া ভুয়া ছবির প্রিন্ট আউট নিয়ে "টক শো" তে হাজির হয়। তারা এক মিথ্যা বারবার বলে সত্য হিসেবে জাহির করার প্রয়াস পায়।

আমি বাক্তিগত ভাবে দেখছি আমার এলাকায় বেশির ভাগ চায়ের দোকানে দিগন্ত টিভি চালু করে রাখা হত সারাদিন। যেসব দোকান পত্রিকা রাখে, তারা আমার দেশ পত্রিকা রাখত বেশি বেশি। যদিও এসব মিডিয়ার ভণ্ডামি আমরা নেটে বহুবার ফাঁস করেছি, কিন্তু বড় একটা জনগোষ্ঠীর কাছেই সেসব পৌছাই না। বড় একটা জনগোষ্ঠী বিশ্বাস করে, এইসব ভণ্ড মিডিয়া নাকি সত্য প্রকাশের জন্য নির্ভরযোগ্য। এদের ভিতরে জামাতের কিছু মাঠ পর্যায়ের নেতা এই বিশ্বাস ঢুকাতে কাজ করে গেছে। সুকৌশলে তারা এই মানুষগুলোকে বোকা বানিয়ে এবং ধর্মের দোহাই দিয়ে তাদের এইসব মিডিয়াকে বিশ্বস্ত করে ফেলে মানুষের মাঝে। প্রচণ্ড সাংগঠনিক শক্তি জামাতের আছে তারা ধর্মকে ব্যবহার করে মানুষকে সুন্দর দিকভ্রান্ত করে। মসজিদে, পাড়ায়-মহল্লায়, তারা ধর্মীয় সমাবেশ করে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধর্ম নিয়ে বয়ান করে। তারপরে মানুষের মন যখন আবেগে ও ধর্মের ভয়ে নরম চোখ ও অন্তর ছল-ছল করে, তখনই তারা সুযোগ বুঝে জামাতের প্রচারণা চালায়, যা মানুষকে বিভ্রান্ত করে ফেলে। মানুষ তখন এদের কথা চোখ বন্ধ করে বিশ্বাস করে। এভাবেই তারা তাদের টার্গেট ধরে একটু-একটু করে এগিয়ে যায়; মানুষের বিশ্বাস নিয়ে তারা রাজনীতি করে।

আর অন্য ক্ষেত্রে সমাজের একটু সুবিধাপ্রাপ্ত যে জনগোষ্ঠী আছে, যারা মোটামুটি দেশ ও দুনিয়ার খবর রাখার চেষ্টা করে, তাদেরকে বিভ্রান্ত করার জন্য আছে জামাতের চাটুকার আসিফ নজরুলের মত সুশীলতার ভেক-ধরা বুদ্ধিজীবী গ্রুপ। এরা খুব সুকৌশলে মানুষকে মিষ্টি ও চতুর কথার ফাঁদে ফেলে টিভি ও পত্রিকায় কলাম লেখে। এরা মানবতার কথা বলে কিন্তু যা শুধু জামাত এবং বিএনপির পক্ষে যায়। ফটিকছড়িতে যখন কুপিয়ে মানুষ মারে জামাত শিবির, এরা তখন চুপ করে গর্তে লুকায়। শুধু জামাত ও বিএনপির সুবিধার জন্যই এরা মানবতার গান গেয়ে গর্ত থেকে বাইরে বেড়াই। আর জনগণ এদের কথাকেই বেদবাক্য মনে করে লাফাতে থাকে।

অন্য দিকে আওয়ামীলীগের দিকে যদি তাকান যায়, তবে এই দলটাকে নির্বোধ মাথামোটা ও লোভী একটা দল বলা যায়। এরা মাঠ পর্যায়ে চাঁদাবাজি, ক্ষমতা, মারামারি এসব নিয়েই বেশি ব্যস্ত। নিজেদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনার দল দাবি করলেও শেখ মুজিবের পরে কেউ সত্যিকারের মুক্তিযোদ্ধার চেতনার নেতা আওয়ামীলীগে ছিল বলে আমি মনে করি না। এরা কিছুক্ষেত্রে যথেষ্ট বুদ্ধিমান, এরা রাজনৈতিক গেম খুব পছন্দ করে, তবে তা দেশের স্বার্থে নয় সম্পূর্ণ নিজের স্বার্থে। এমনকি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকেও আমি যথেষ্ট দেশপ্রেমিক মনে করি না। সব ভণ্ড দেশ লুটে খাওয়ার জন্য প্রস্তুত, কিন্তু গাছের ফল খাওয়ার জন্য গাছটাকে যে বাঁচানো জরুরি, এই সত্যটাই তারা ভুলে যায়।

এখন আমাদের বাঁচতে হলে কোন রাজনিতিকদের দিকে তাকিয়ে থাকলে চলবে না। পুরান আর অথর্ব দল তারা নিজেদের টানতেই ব্যস্ত। একমাত্র তাদের যারা সমর্থন করে তারাই এদের কাছে জনগণ, জনগণের অন্য মানে এরা বুঝে না। এরা ধর্ম রাজনীতি এসব নিয়ে ঘোট পাকিয়ে আমাদের বিভ্রান্ত করেই যাবে। এখন বিকল্প ভাবার সময় এসেছে। জাগরণ মঞ্চ শুরু হwওয়ার পর থেকে আওয়ামীলীগকে নিয়ে ভেবেছিলাম এবার তারা মানুষের কথা ভাবতে শিখবে, কিন্তু ওই যে পুরাণ বাতের ব্যথা তাদের রাজনিতিক গেম খেলতে অনুপ্রাণিত করল। তারা গাছেরটা খেয়ে তলেরটা কুড়ানোর অপেক্ষায় বসে থাকল। আর মাঝখানে নেপো হয়ে দই মেরে দিল জামাত শিবির। তারা নাস্তিকতার ধুয়া তুলে পথে নামাল হেফাজত আর ওই অতি লোভী আওয়ামীলীগ হেফাজতকে খুশি করতে ধরল আমাদের জাগরণ মঞ্চ সমর্থক চার নিরীহ ব্লগার -- শুধুমাত্র ধর্ম বিশ্বাসে ভিন্নমত প্রকাশ করার জন্য। ৫ তারিখে হেফাজত তাণ্ডবের পর দিগন্ত আর ইসলামিক টিভি বন্ধ করল আগেই আমার দেশ পত্রিকা বন্ধ করে মাহুমুদুর রাহমানকে গ্রেপ্তার করে ব্লগার আটক জায়েজ করল। অথচ এই মাহমুদূর রহমান গ্রেপ্তারি পরওয়ানা মাথায় নিয়েও পত্রিকা প্রকাশ করে গেছে এবং নিয়মিত গুজবের জন্ম দিয়ে গেছে, তখন সরকার হাত-পা না নেড়ে বসে বসে মজা দেখেছে। বিএনপি, জামাত যেমন ধর্মীয় আবেগ নিয়ে খেলছে, তেমনি আওয়ামীলীগও খেলছে আমাদের দেশপ্রেম আর ৭১ এর আবেগ নিয়ে। এখন আমাদেরকে বাঁচতে হলে একটা শেষ লড়াই দিতেই হবে।

গন জাগরণ মঞ্চের উপরে এখনো আমার অগাধ আস্থা। আমি বিশ্বাস করি তারুণ্য একদিন জয় ছিনিয়ে আনবেই; জনতার জয় হবেই। তবে তার আগে আমাদের তরুণদেরকে সব বিভেদ এবং ব্যক্তিগত লাভ-ক্ষতির হিসেব ভুলে এক প্ল্যাটফর্মে এসে দাঁড়াতে হবে। আমাদের হাতে তুলে নিতে হবে আগামীর ভবিষ্যৎ। সাভারে আমরা যেমন হাতে হাত ধরে এগিয়ে এসেছি আর্ত মানবতার সেবায়, ঠিক তেমনি এই দেশটাকে বাঁচাতে হলে আমাদেরকে হাতে হাত রেখে লড়তে হবে। বিভিন্ন প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী আমাদের পথে কাটা বিছাবে, আমাদের মাঝে বিভেদ তৈরি করবে, তারপরও আমাদের আগাতেই হবে। নইলে আগামী প্রজন্ম আমাদের ক্ষমা করবে না। জয় আমাদের হবেই। তবে তা আদায় করতে হবে সুকৌশলে, ধীরে ধীরে, সমাজের গভীরে ঢুকে মানুষকে বুঝিয়ে আমাদের সমর্থক বানাতে হবে। আমাদের জাগরণটাকে ছড়িয়ে দিতে হবে সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে, গন-মানুষের পাশে বসে তাদেরকে রাজনীতি সচেতন করতে হবে। তাদেরকে সঠিক ও নির্ভুল তথ্য সরবরাহ করতে হবে, পাড়ায় পাড়ায় জাগরণ মঞ্চ বা জাগরণ পাঠ কক্ষ গড়ে তুলতে হবে, পাড়ার মুরব্বি ও সম্মানীয় ব্যক্তিদেরকে বুঝিয়ে সেখানে সপ্তাহে একদিন আলোচনা সভা বসাতে হবে। সেখানে একটা নির্ভুল তথ্যকেন্দ্র খুলতে হবে দলমত নির্বিশেষে সবাইকে আমন্ত্রণ করে জাগরণ মঞ্চের দাবি ও পরবর্তী করনীয় সম্পর্কে সবার মতামত সংগ্রহ করতে হবে। জামাত শিবির যদি শক্তিশালী সংগঠন দিয়ে অপপ্রচার চালাতে পারে, তবে আমরা কেন সত্যি প্রচারের জন্য শক্তিশালী সংগঠন বানাতে পারব না?

হ্যাঁ, আজকের তরুণের কাছে এই দেশ-মায়ের দাবিঃ  দেশটাকে বাঁচাতে হলে স্বেচ্ছাশ্রমে আমাদেরকে গড়ে তুলতে হবে এই সমাজটাকে। এখনি আমরা হার্ডলাইনে না গিয়ে সমাজের ভিতর থেকে আমাদেরকে বদলানো শুরু করতে হবে। আমি বিশ্বাস করি, আমরা শুধু কিবোর্ড যোদ্ধা না। আমরা যুদ্ধ ক্ষেত্রে নেমেই যুদ্ধ করতে পারি। আর আমাদের সবচাইতে বড় হাতিয়ার হবে এই ইন্টারনেট, যা দিয়ে আমরা যোদ্ধারা মিলিত হবো আর অবাধ তথ্য ও প্রমাণ আমরা ছড়াতে থাকবো দেশের আনাচে কানাচে। ব্যক্তিগতভাবে আমার যুদ্ধ চালু আছে, আমি আমার আশপাশের মানুষগুলোকে প্রতিনিয়ত এগিয়ে যেতে সাহায্য করি। আর্থিক সামর্থ্য আমার কম, কিন্তু মানসিক সামর্থ্য নিয়ে আমি মাঠে আছি। আমিও সুকৌশলে তাদের ভেতর জ্ঞানের ক্ষুধা তৈরি করি। তারপর তারা নিজেরাই জ্ঞান খুঁজতে উদ্যত হয়।

আজ তরুণেরা ঝিমিয়ে গেলে বুড়োরা আমাদের এগোতে দেবে না, তাই তো জেগে থাকুন হে তরুণ, ধর্ম যার যার দেশ টা সবার তাইতো আসেন আগে দেশ বাচাই। মুসলমান, হিন্দু, নাস্তিক ভাগাভাগি আমরা পরে করি, আশপাশে অনেক বিদেশি শকুন কিন্তু ওঁত পেতে আছে, ওদেরকে সুযোগ দেওয়া যাবে না, আগে আমার মা আমার দেশ বাচুক তারপর না হয় নাস্তিক দের আপনারা ফাঁসি দিয়েন, কিন্তু দেশের এই ক্রান্তিকালে আমরা যদি ভাগ হয়ে যাই তবে কিন্তু সর্বনাশ ঠেকানো যাবে না, অন্ধ হলেই প্রলয় কিন্তু বন্ধ হয় না। তাই আপনি যদি একজনকেও পারেন নিয়ে পথে নামুন অথবা মানসিক ভাবে পাশে থাকুন কারো অপপ্রচারে আমাদের মাঝে বিভেদ তৈরি করবেন না, নিজে সত্য জানুন, অপর কে জানাতে সাহায্য করুন।

কিন্তু অধ্যাপক নামধারী বা বড় বড় ডিগ্রি ধারি মানুষের কথা বিশ্বাস করার আগে তার ব্যাক গ্রাউন্ড চেক করুণ, এবং সঠিক মানুষের পাশে থাকুন। জয় আমাদের হবেই। তবে প্রয়োজন হলে জয় ছিনিয়ে আনতে হবে। শুধু হাহাকার আর একে অপরকে দোষারোপ না করে ভাবুন ভাবতে বসুন আপনি নিজের ভুলে দেশের কোন বড় ক্ষতি করে ফেলছেন না তো? আমাদের মনে রাখতে হবে দেশ কে ১৪ কোটি ভাগ করলে আপনিও এক ভাগে পরেন, এই দেশ টা নষ্ট হলে আপনিও কিন্তু বাদ থাকবেন না, তাই শুধু মাত্র বিরোধিতা করার জন্য আমরা যেন ভাগ না হয়ে যাই, আজ ১৪ কোটি মানুষের ২৮ কোটি হাত পরস্পরকে গভীর মমতায় জড়িয়ে ধরতে হবে, তবেই এই দেশ বাচবে, আর সেই হাতে হাত রেখে সেতু বন্ধনের কাজ আপনাকেই শুরু করতে হবে কারো জন্য ফেলে রাখলে হবে না, কে নাস্তিক আর কে হিন্দু এই চিন্তা দূর করুন হাতে হাত রাখুন।

মানবতার জয় হোক, মানুষের জয় হোক, জয় হোক তরুণের, আগামী পৃথ্বী ভরে উঠুক এক ঝাঁক সুস্থ সুন্দর মনের তরুণ তরুণীতে। জয় বাংলা, জয় প্রজন্ম। 

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

আবার আমরা মানুষ হই

মহামান্য সরকার খেয়াল কইরা

জয় হবে সত্যের , জয় হবে মানবতার , জয় হবে মানুষের